AlokitoBangla
  • ঢাকা রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯
banner
চাঁদাবাজি, নৌ ডাকাতি ও মেঘনায় অবৈধ বালু ব্যবসায়ও জড়িত থাকার অভিযোগ

হোটেলবয় থেকে শত কোটি টাকার মালিক মোক্তার


FavIcon
আলোকিত বাংলা ডেস্ক:
প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২২, ০৯:১২ পিএম
হোটেলবয় থেকে শত কোটি টাকার মালিক মোক্তার
হোটেলবয় থেকে শত কোটি টাকার মালিক মোক্তার

বিদেশে নারী পাচার, ক্যাসিনো ও ব্ল্যাকমেইলিং। সবশেষ অবৈধ মদ-বিয়ারের ব্যবসা। এসব করেই তিনি এখন শতকোটি টাকার মালিক। দেশে-বিদেশে আছে একাধিক বাড়ি-গাড়ি ও অঢেল টাকা। রূপকথাকেও হার মানানো এমন সত্য কাহিনীর প্রধান চরিত্র মোক্তার হোসেন ওরফে মোক্তার গাজী। মাত্র এক দশক আগেও তিনি ছিলেন মামুলি হোটেলবয়।

তবে বিদেশি মদের ব্যবসায় তার সৌভাগ্যের চাকা ঘোরে। অঢেল অর্থবিত্ত আর বিলাসী জীবন যেন স্বেচ্ছায় ধরা দেয়। বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরায় কিংফিশার মদের বারে অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর বার মালিকের অন্ধকার জীবনের পিলে চমকানো তথ্য বেরিয়ে আসে।

বারে অবৈধ মদ ব্যবসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশিদ শনিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, যেখানেই অবৈধ মদ-বিয়ারসহ মাদক ব্যবসা হবে, সেখানেই অভিযান চালাবে গোয়েন্দা পুলিশ। কারণ উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণী এসব মদের বার ও সিসা লাউঞ্জে যাতায়াত করায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিংফিশার বারের মালিক মোক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

পুলিশ জানায়, মোক্তারের দেশের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার জহিরাবাদ গ্রামে। বিএনপির নেতা হিসাবে এলাকায় তার পরিচিতি। এক সময় জাতীয় পার্টি করতেন। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি ভোল পাল্টান। যোগ দেন আওয়ামী লীগে। ক্ষমতার দাপটে এলাকায় নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীও গড়ে তোলেন। চাঁদাবাজি, নৌ ডাকাতি ও মেঘনায় অবৈধ বালু ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, মোক্তার ২০০৮ সালে রাজধানী বারিধারায় ‘এভিনিউ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’র কর্মচারী ছিলেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে নাম লেখান মাদক ব্যবসায়। গুলশান-বনানী এবং উত্তরায় হকারি করতেন। একপর্যায়ে বাড্ডা এলাকার সাবেক কাউন্সিলর বিএনপির নেতা কাইয়ুমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এ সুবাদে বিভিন্ন বারে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিদেশি মদ-বিয়ার সরবরাহ করতেন।

তবে ২০০৮ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে একাধিক বার লাইসেন্স পান মোক্তার। গুলশান-১ এলাকায় অবস্থিত লেকভিউ এবং গুলশান-২ এ কোরিয়ান ক্লাব (কেবি) নামে বার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এছাড়া গুলশান ও বনানী এলাকায় একাধিক আবাসিক হোটেলে ডিসকো এবং ডিজে পার্টির আয়োজক ছিলেন তিনি।

সূত্র বলছে, মদের বার ও আবাসিক হোটেল ব্যবসার সূত্রে মোক্তার পৌঁছে যান সমাজের উপর তলায়। প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তিনি চাঁদপুর এলাকার এক মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে অবৈধ ব্যবসা করেও ঘুরেন প্রকাশ্যে। কয়েক বছর ধরে তিনি নিজেকে সমবায় অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব হারুন-অর-রশিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেন। এ সুবাদে তিনি পুলিশ প্রশাসনেও প্রভাবশালী বলে পরিচিত।

তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদ্য অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত সচিব হারুন-অর-রশিদ শনিবার  বলেন, মোক্তার নামের কোনো মদ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা কোনোটিই তার নেই, কখনো ছিলও না। তবে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। এ সুবাদে অনেকেই তার কাছে মন্ত্রণালয়ে দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসতেন। তাদের কেউ হয়তো উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার নাম ভাঙিয়ে থাকতে পারে। বাস্তবে মোক্তার নামের কাউকে তিনি চেনেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক কারণেও কোণঠাসা করতে তার বিরুদ্ধে অপ-প্রচার চালানো হতে পারে।

সূত্র বলছে, গত কয়েক বছর ধরে মোক্তার নিয়মিত সচিবালয়ে যাতায়াত করতেন। এর সূত্র ধরে পুলিশের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গেও তার দহরম-মহরম। পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ ‘ওপেন সিক্রেট’। পুলিশে হট কানেকশনের কারণে মোক্তারের মদের বারে নানা অনিয়ম হলেও সংশ্লিষ্টরা ছিলেন ‘নীরব দর্শক’র ভূমিকায়। এ সুযোগে উত্তরা, মিরপুর, গুলশান ও ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে মোক্তারের মদ ব্যবসার বিস্তার ঘটে। এসব স্থানে নামে-বেনামে পাঁচটি মদের বারের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মদের ব্যবসা করলেও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করেন না মোক্তার। আইন অনুযায়ী রাত ১০টার মধ্যে বার বন্ধে বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মোক্তারের মালিকানাধীন গুলশান-২ এলাকার কিংফিশার বার মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রকাশ্যে শত শত তরুণ-তরুণী দলবেঁধে বারে ঢোকেন। এমনকি একটি লাইসেন্স দিয়ে একাধিক মদের বার চালানো হলেও মাদক কর্মকর্তারা মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। কিন্তু সবকিছু দেখেও নির্বিকার পুলিশ। এসব দেখে এলাকাবাসীর অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ কারণে ভুক্তভোগীরা বিলম্বে হলেও ডিবির অভিযানকে স্বাগত জানান।

পুলিশ জানায়, নারী পাচার এবং বিদেশি মদের ব্যবসায় অঢেল সম্পদের মালিক মোক্তার। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি আছে তার। সেখানেই তার পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এছাড়া মালয়েশিয়ার আমপাং এলাকায় ফার্ম হাউজের খোঁজ মিলেছে। এখন দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তার সম্পদের সন্ধান চলছে।

সূত্র জানায়, চাঁদপুরের মেঘনায় অবৈধ বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন মুক্তারের দু’ভাই গাজী সেলিম রেজা ও গাজী সম্রাট। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প এখন হুমকির মুখে। এ নিয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেও কোনো ফল হয়নি। উল্টো অনেকেই পুলিশি হয়রানির মুখে পড়েন। এমনকি বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ স্থানীয় সংসদ-সদস্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি (ডিও) দেন। কিন্তু এতেও কাজ হয়নি। একপর্যায়ে ২০২০ সালের ২৩ জুন স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন হাইকোর্ট।

 উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর ২ বছর বন্ধ থাকলেও বর্তমানে ফের বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে। এজন্য নেপথ্যে তৎপর তার দুই ভাই। কিন্তু প্রকাশ্যে এ নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস নেই স্থানীয়দের। কারণ মোক্তারের ভাইদের বিরুদ্ধে কিছু বললে পুলিশি হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অথচ মোক্তারের দুই ভাই নৌ ডাকাতি মামলার আসামি (মামলা নং ২৮/ ২৫-০৭-২০২১) ও চাঁদপুর সদর মডেল থানা (মামলা নং ২৫/ ১৬-৮-২০২০)। এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে মোহনপুর, গজারিয়া ও চাঁদপুর নৌ-ফাঁড়িতে।

পুলিশ জানায়, বিদেশি মদের চোরাকারবার ছাড়াও রাজধানীর আরামবাগ ক্লাবে অবৈধভাবে ক্যাসিনো কারবারে জড়িত ছিলেন মোক্তার। ২০১৯ সালে র‌্যাবের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে বিদেশে পালিয়ে যান তিনি। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি দেশে ফেরেন। এছাড়া মোক্তারের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে মোক্তার হোসেন ওরফে মোক্তার গাজী শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, এসব অভিযোগ অবান্তর এবং ভিত্তিহীন। তার বৈধ প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। যেসব মদ-বিয়ার আটক করা হয়েছে তার সবই বৈধ। হয়রানিমূলক অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে একটি ঘরে আটকে রাখে পুলিশ। যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি হোটেলবয় ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে এভিনিউ হোটেলের মালিক ছিলেন তিনি। একটি মহল তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় লিপ্ত। তিনি আজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। এলাকায় সুনামের সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে আসছেন।

 

Banner
Side banner

অপরাধ বিভাগের আরো খবর

Small Banner
Side banner